মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে তিন বিচারককে পদায়ন কেন বেআইনি নয়
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের তিনজন সদস্যকে দুজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে পদায়ন বা নিয়োগ প্রশ্নে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মো. তৌফিক ইনাম ও বিচারপতি মাহমুদ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বৃহস্পতিবার এ রুল দেন।
তিনজন বিচারিক কর্মকর্তাকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে পদায়ন বা নিয়োগসংক্রান্ত গত ২৫ ফেব্রুয়ারি, গত ৯ মার্চ ও ১৬ সেপ্টেম্বরের স্মারক কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নির্বাহী বিভাগে নিয়োগ বা পদায়ন করা থেকে বিরত থাকতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, সে বিষয়েও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।
আইন সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবসহ বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের তিনজন সদস্যকে দুজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে পদায়নের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশেদুল হক খোকন গত ২১ রিটটি দায়ের করেন।
রিট আবেদনে বলা হয়, আইন ও বিচার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জি এম ফারহান ইসতিয়াককে (যুগ্ম জেলা জজ) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে পদায়ন করে গত ৯ মার্চ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আইন ও বিচার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) কামরুল হাসানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু বকর সিদ্দিককে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (সিনিয়র সিভিল জজ) হিসেবে পদায়ন করে ১৬ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শের কথা উল্লেখ রয়েছে।
নিয়োগ বা পদায়নসংক্রান্ত ওই স্মারক বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার সাংবিধানিক স্কিম, ২০২৫ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালার তফসিলে নির্ধারিত কাঠামো ও মাসদার হোসেন মামলায় আপিল বিভাগের ঘোষিত নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।
রিট আবেদনটি গত ২৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য ওঠে। সেদিন হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ রিটটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেন। এরপর হাইকোর্টের নিয়মিত বেঞ্চে রিটটি শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হয়। গত মঙ্গলবার শুনানি নিয়ে আদালত আজ আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মিয়া মোহাম্মদ ইশতিয়াক। রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আখতার হোসেন মো. আবদুল ওয়াহাব ও আল ফয়সাল সিদ্দিকী শুনানিতে ছিলেন।
রিট আবেদনের যুক্তিতে বলা হয়, বিচারিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নির্বাহী পদে বদলি/নিয়োগের উদ্দেশ্যে জারি করা স্মারকগুলো ২০২৫ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালার আওতা ও পরিধির বাইরে। যে পদগুলোতে বিচারিক কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে, সেসব পদ বিধিমালার ৪(১) বিধি কিংবা ওই বিধিমালার তফসিলে উল্লেখ নেই। সে কারণে স্মারকগুলো বেআইনি হিসেবে ঘোষণার যোগ্য।
বিচার বিভাগ পৃথক্করণ–সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে যুক্তিতে বলা হয়, আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুসারে সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদের অর্থ জুডিশিয়াল সার্ভিস প্রজাতন্ত্রের একটি সার্ভিস হলেও এটি প্রজাতন্ত্রের বেসামরিক নির্বাহী ও প্রশাসনিক সার্ভিস থেকে কার্যত ও কাঠামোগতভাবে সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র। কোনোভাবেই জুডিশিয়াল সার্ভিসকে বেসামরিক নির্বাহী ও প্রশাসনিক সার্ভিসের সমপর্যায়ে রাখা যাবে না। জুডিশিয়াল সার্ভিসকে এসব সার্ভিসের সঙ্গে একীভূত, বিলুপ্ত, প্রতিস্থাপিত ও একত্র করা যাবে না। বিচারিক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের একান্ত বা ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে বদলি/নিয়োগ ওই মামলায় ঘোষিত নীতির পরিপন্থী।
রিট আবেদনকারী পক্ষের ভাষ্য, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের চাকরি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যস্ত করার সুযোগ নেই। অথচ পদায়ন–সংক্রান্ত স্মারকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন চাকরি ন্যস্ত করার কথা উল্লেখ রয়েছে, যা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের নীতির পরিপন্থী।