লগি-বৈঠা সহিংসতার ২০ বছর: আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আগে যা যা ঘটেছিল

Article Information Author, তারেকুজ্জামান শিমুল Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা Published ৩ মিনিট আগে পড়ার সময়: ৯ মিনিট ২০০৬ সাল, সেই বছরের ২৮শে অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পাল্টা-পাল্টি সমাবেশ ঘিরে রীতিমত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল ঢাকার পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকা।
লাঠি-সোটা ও আগ্নেয়াস্ত্র হাতে সেখানে রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দল দু'টির নেতাকর্মীরা।
সেদিন ঢাকার রাস্তায় যেভাবে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছিল, সেটি দেখে অনেকেই 'স্তম্ভিত' হয়েছিলেন বলে তখনকার গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকায় সেদিনের সংঘর্ষে কমপক্ষে পাঁচজন প্রাণ হারান, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। একপর্যায়ে ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে।
সেসময়ের পত্রপত্রিকার তথ্যমতে, কেবল ২৮শে অক্টোবরের সহিংসতাতেই সারা দেশে প্রায় এক ডজন মানুষ নিহত এবং শতাধিক আহত হন।
এমন পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে অপারগতা প্রকাশ করলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।
আড়াই মাসের মাথায় সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেনা সমর্থিত ওই সরকার পরবর্তীতে 'ওয়ান-ইলেভেন সরকার' নামেও পরিচিতি পায়।
কিন্তু এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল কোথা থেকে? আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যকার সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটই-বা তৈরি হয়েছিল কীভাবে?
১১ জানুয়ারি ২০১৮ 'কাশ্মীরকে রক্ষা করছে পাকিস্তান'- ফারুক আবদুল্লাহর মন্তব্য নিয়ে ভারতে বিতর্ক ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ছাত্র আন্দোলন কীভাবে সার্বিয়ার ভুচিচের ১৪ বছরের ক্ষমতার পতন ঘটাল ২৭ অক্টোবর ২০২৬ End of আরও পড়তে পারেন:
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা। বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ওই সময় বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইস্যুতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় ওই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
"এই ইস্যুতে দলগুলোর মতবিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কোনোপক্ষই ছাড় দিতে রাজি হচ্ছিল না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিধান তখন ছিল, সংবিধান অনুযায়ী সেটার প্রধান হওয়ার কথা সবশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতির।
সেই অনুযায়ী, তখনকার সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বানাতে চায় তৎকালীন জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
কিন্তু মি. হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় সেসময়ের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা।
তারা অভিযোগ তোলে, একসময় বিএনপি'র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে আবারও ক্ষমতায় বসার 'ষড়যন্ত্র' করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট।
এই পরিস্থিতির দুই বছর আগে, ২০০৪ সালের মে মাসে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করেছিল চারদলীয় সরকার।
মি. হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা বানানোর জন্যই ওই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করে বিরোধীরা।
কাজেই তাকে ওই পদে বসানো হলে লাগাতার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশ অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারী দেয় আওয়ামী লীগ।
এর বিপরীতে বিএনপি-জামায়াতও পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দেয়।
"পাল্টা-পাল্টি এমন অবস্থানের কারণে একপর্যায়ে তাদের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে," বলেন লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
ইনস্টাগ্রামে বিবিসি বাংলা ফলো করতে ক্লিক/ট্যাপ করুন এখানে
সাবেক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিতে না পারেন, সেজন্য বিএনপি জোট সরকারের শেষদিকে মিত্রদলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন শুরু করে আওয়ামী লীগ।
এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক যে অচলাবস্থা তৈরি হয়, সেটির সমাধানে দু'পক্ষকে সংলাপে বসার আহ্বান জানান জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশি মিশনগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা।
একপর্যায়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও বিরোধীদল আওয়ামী লীগ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়।
ওই বছরের ২৮শে অক্টোবর ছিল চারদলীয় সরকারের শেষদিন।
ওই দিনের আগ পর্যন্ত বিএনপি'র তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সেসময়ের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল অন্তত ছয় দফায় সংলাপে বসেন।
কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ নির্বাচনকেন্দ্রিক আরও বেশকিছু ইস্যুতে একমত হতে না পারায় সংকট থেকেই যায়।
২৭শে অক্টোবর রাত ১২টার পর অষ্টম জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি ঘটে। তার আগে, ওইদিন সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
সেখানে ক্ষমতায় থাকার পাঁচ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চারদলীয় জোট সরকারের সফলতা তুলে ধরে তাদেরকে আবারও ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান তিনি।
একইসঙ্গে, সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধান না হওয়ায় দেশবাসীকে হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দেন।
ভাষণে খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন, সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ীই ব্যবস্থা গ্রহণ করে 'একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন' করা হবে।
তার এমন বক্তব্যের পর অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল।
সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাসখানেক আগেই একটি জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলটির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ভাষণে নির্দেশনা দেন যে, তাদের দাবি আমলে না নিয়ে সাবেক প্রধানবিচারপতি কেএম হাসান যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন, তাহলে সারা দেশ থেকে যেন তারা লগি-বৈঠা হাতে ঢাকার পথে রওনা হন।
তার সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই ২৭শে অক্টোবর রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, যিনি ২০১৩ সালে মারা গেছেন।
দাবি আদায়ে তিনি ২৮শে অক্টোবর ঢাকার পল্টন ময়দানে সমাবেশ করারও ঘোষণা দেন। ফলে সেখানে যোগ দিতে রাতেই লগি-বৈঠা হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন সারা দেশের তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ১৪ দলের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে অনির্দিষ্টকালব্যাপী অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ নেতা মি. জলিল।
অন্যদিকে, তাদের প্রতিহত করার জন্য পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী।
এর মধ্যে বিএনপি নয়াপল্টনে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং জামায়াত বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশের ঘোষণা দেয়।
আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপি'র সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলও একইদিন পল্টন ময়দানে সমাবেশ করার ঘ